
বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ক্রমাগত পরিবেশগত অবক্ষয় আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্রমান্বয়ে জলমগ্ন হচ্ছে। পরিবেশের এই অবনতি হচ্ছে মূলত বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রতিকূল প্রভাবের কারণে। আর আমাদের এই বিশ্ব এমন উষ্ণ হয়ে পড়ছে বেশ কিছু কারণে, যার মধ্যে অন্যতম হলো বিশ্বব্যাপী সামরিকীকরণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা।
সামরিকীকরণ এবং ক্ষতিকারক গ্যাস
বিশ্বব্যাপী সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাষ্ট্রগুলোকে বিশ্বের বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অভূতপূর্ব ও অনিয়ন্ত্রিত সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাষ্ট্রগুলোকে সংঘাত ও যুদ্ধের জন্য ধ্বংসাত্মক অস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, সংগ্রহ ও ব্যবহারের দিকেও চালিত করছে।
অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক যানবাহনসহ সামরিক সরঞ্জামের এই ধরনের উৎপাদন ও ব্যবহারে কয়লা ও তেলের মতো জ্বালানি শক্তির ব্যাপক প্রয়োজন হয়।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বা দহনের ফলে লক্ষ লক্ষ টন ক্ষতিকর ও বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে নির্গত হয়, যা পূর্বে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে আবদ্ধ ছিল। এই ধরনের ক্ষতিকর গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন এবং সালফার ডাইঅক্সাইড – যার সবগুলোই আমাদের গ্রহের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
উপকূলীয় এলাকাগুলো প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত
বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের প্রধান পরিবেশগত প্রভাব হলো গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রমান্বয়িক বৃদ্ধি । বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পর্বতের বরফ ও মেরু অঞ্চলের হিমবাহ গলে যায় , যা বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে ফেলে ।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক উপকূলীয় এলাকা ধীরে ধীরে জলের নীচে ডুবে যাচ্ছে । সম্ভবত কয়েক দশকের মধ্যেই বিশ্বের বর্তমান উপকূলরেখাগুলো বিলীন হয়ে যাবে, যা ঐসব উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ বাসিন্দাকে জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত করবে।
একটি চিত্র
সামরিকীকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জলমগ্নতার মধ্যকার সম্পর্কের একটি দৃষ্টান্ত নিচে দেওয়া হলো:
সিরীয় সরকারের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যারেল বোমা ও রাসায়নিক বোমা ব্যবহারের ফলে কার্যত বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। একইভাবে, ইয়েমেন ও ইউক্রেনে কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলেও বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ। বৈশ্বিক তাপমাত্রার এই বৃদ্ধির ফলে আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, যা বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকাগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে ফেলছে।
ইতিমধ্যে ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) প্রতি বছর ১০ সেন্টিমিটার করে ডুবে যাচ্ছে , যার ফলে শহরটি কয়েক দশকের মধ্যেই সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশের ৬-৮ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জলমগ্ন হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ।
পর্যবেক্ষণ
রাষ্ট্রসমূহের সীমান্ত পরিবেশগত অবক্ষয়ের প্রভাবকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আটকাতে পারে না। ফলে, পৃথিবীর এক অংশের সামরিকীকরণের পরিবেশগত প্রভাব সহজেই পৃথিবীর অন্য অংশের দূরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে পৌঁছে যায়, যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর আবহাওয়ার মারাত্মক অবনতি ঘটে। এভাবে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধগুলো শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোরই নয়, বরং পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ (পিআইসিআইআর)-এর জার্মান গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের প্রভাব অবিলম্বে হ্রাস করা না হলে, একের পর এক অপ্রতিরোধ্য ঘটনা ঘটবে, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাসকারী উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
অতএব, পিআইসিআইআর-এর সতর্কবাণী বিবেচনায় নিয়ে এই পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে যে, পরিবেশগত অবক্ষয়ের প্রধান শিকার দেশগুলো যেন বিশ্বব্যাপী সামরিকীকরণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হ্রাস নিশ্চিত করে, কারণ সামরিকীকরণই বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যথায়, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ উপকূলীয় বাসিন্দা অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন হতে পারে।
এই বিশ্লেষণটি গত ১৫ জানুয়ারী, ২০১৮-এ অপেড কলাম সিন্ডিকেশণ-এ প্রকাশিত কলাম থেকে অনুবাদকৃত। মূল কলামটি পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:

